"ক্লিন এনার্জিঃ বিদ্যুত উৎপাদনক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সম্ভাবনা ও এর ভবিষ্যৎ" 


ক্লিন এনার্জির কথা বলতেই আমরা সাধারণভাবে ভেবে নিই নবায়নযোগ্য শক্তির উৎসের কথা। তবে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎসের কথা বলার চেয়ে ক্লিন এনার্জি বলাটাই হয়তো সহজ। কারণ এ শব্দটি থেকে আমাদের ধারণা আসে এটি এমন একটি শক্তির উৎস যা ব্যবহারে তুলনামূলক কম দূষণ হয়, পরিবেশবান্ধব, সহজ উৎস যা ফুরিয়ে যাওয়ার ভাবনা নেই -এমন ধারণা নিয়েই ক্লিন এনার্জি বা নবায়নযোগ্য শক্তি উৎসের সূচনা। 
ক্লিন এনার্জির যেসব উৎসগুলো আমাদের প্রকৃতিতে রয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ 
• Solar Power বা সৌরশক্তি
• Geothermal বা ভূতাপীয় শক্তি 
• Wind energy বা বায়ুশক্তি 
• Biomass বা জৈবশক্তি 
• Ocean energy (tidal power) বা সমুদ্রের ঢেউ শক্তি 
• Hydropower বা জলবিদ্যুৎ
এবার আসি এই উৎসগুলোর প্রকৃতি, কর্মদক্ষতা ও ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে আলোচনায়।
সোলার পাওয়ার বা সৌরশক্তিঃ এই প্রক্রিয়ায় সূর্যালোকের রশ্নি থেকে আসা ফোটন কণাকে সোলার প্যানেলের ফটোভোল্ট্যায়িক সেলের মাধ্যমে বিভব পার্থক্য সৃষ্টি করে উৎপাদন করা হয় বিদ্যুত। সৌরশক্তির সহজপ্রাপ্যতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা পেতে পারি ইলেকট্রিসিটি, সোলার কুকার, ওয়াটার হিটার এমনকি এয়ার কন্ডিশনার। বর্তমানে সোলার প্যানেল সিস্টেমকে আরও এফিসিয়েন্ট করতে বিজ্ঞানীরা কাজ করে যাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে যে, আগামী দশ বছরের মধ্যে সোলার এনার্জি ফসিল ফুয়েল থেকেও সস্তা ও সহজলভ্য হবে। 
জিওথার্মাল বা ভূতাপীয় শক্তিঃ পৃথিবীর ভূ-অভ্যন্তরভাগের উত্তাপকে কাজে লাগিয়ে এ প্রক্রিয়ায় বাস্পচাপ দ্বারা টার্বাইন ঘুরানোর মাধ্যমে বিদ্যুত উৎপাদন করা হয় এ প্রক্রিয়ায়। এই প্রক্রিয়া যদিওবা সোলার বা উইন্ড এনার্জির মতো জনপ্রিয় নয়, তবে এর কর্মদক্ষতা কোন অংশেই কম নয়। 
উইন্ড এনার্জি বা বায়ুশক্তিঃ ক্লিন এনার্জিগুলোর মধ্যে বায়ুশক্তির ব্যবহার তুলনামূলক বেশ প্রাচীন জনপ্রিয় এবং এফিসিয়েন্ট একটি ব্যবস্থা। এই প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহকে কাজে লাগিয়ে টার্বাইন ঘুরানোর মাধ্যমে বিদ্যুত উৎপাদন করা যায়। স্বাভাবিক বা তুলনামূলক বেশি বায়ুপ্রবাহ আছে এমন সব স্থানেই উইন্ডমিল বা বায়ুকল স্থাপন করা যায়। তবে ঘণ্টায় যেসব স্থানে ৭-১২ মাইল প্রতি ঘন্টায় বায়ুপ্রবাহ পাওয়া যায়, যেমন উপকূলীয় অঞ্চল, পাহাড় চূড়া, সমুদ্র সৈকত, উন্মুক্ত স্থান – এসব স্থানে টার্বাইন স্থাপন করা হলে সর্বোচ্চ এফিসিয়েন্সি পাওয়া যায়। তবে এফিসিয়েন্সি বা কর্মদক্ষতা টার্বাইনের ধরনের ওপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল। উইন্ড টার্বাইন দুই ধরণের হয় সাধারণত। হরাইজনটাল এক্সিস বা আনুভূমিক অক্ষের টার্বাইন এবং ভার্টিক্যাল এক্সিস বা উল্লম্বিক অক্ষের টার্বাইন। যেসব স্থানে বায়ুপ্রবাহ বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে আসে সেসব স্থানে ভার্টিক্যাল এক্সিস উইন্ড টার্বাইনের এফিসিয়েন্সি সবচেয়ে বেশি হয়। আর একমুখী বায়ুপ্রবাহের স্থানগুলোর ক্ষেত্রে হরাইজনট্যাল এক্সিস উইন্ড টার্বাইন কার্যকর। বর্তমানে বিশ্বের বেশিরভাগ উন্নত দেশগুলোর মধ্যেই উইন্ড এনার্জি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। 
ডেনমার্ক ও জার্মানি উইন্ড এনার্জি থেকে বিদুত উৎপাদনে এগিয়ে আছে। 
বায়োম্যাস বা জৈবশক্তিঃ উদ্ভিদ এবং প্রাণির জৈব বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুত তৈরি করার প্রক্রিয়াই বায়োম্যাস। কাঠের গুঁড়া, কৃষি বর্জ্য,প্রাণির মলমূত্রকে বিশেষ পচনকারী ব্যবস্থায় পচিয়ে এসব থেকে গ্যাস তৈরি করা হয়, যা পোড়ানোর উপযোগী। এক্ষেত্রে গ্যাস পুড়িয়ে শক্তি উৎপাদন করা হয়। সুইডিশরা তাদের মূল বিদ্যুত খাতের ৩০% পেয়ে থাকে বায়োম্যাস থেকে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এ হার ১২%। বায়োম্যাস এবং বায়োফুলের ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং এ নিয়ে উচ্চতর গবেষণা চলছে। 
টাইড্যাল পাওয়ার বা ঢেউ থেকে শক্তিঃ সমুদ্রে প্রতিদিনই ক্রমাগতভাবে জোয়ার ভাটা চলছে। এই জোয়ার ভাটার ফলে যে ঢেউ তৈরি হচ্ছে, তা কাজে লাগিয়ে টার্বাইন ঘুরিয়ে উন্নত দেশগুলোয় তৈরি করা হচ্ছে বিদ্যুত। সমুদ্রসৈকতে এসব টাইড্যাল প্ল্যান্ট বসিয়ে আমরা আমাদের দেশেও তৈরি করতে পারি এমন বিদ্যুত উৎপাদন প্রকল্প। 
হাইড্রো পাওয়ার বা জলবিদ্যুতঃ জলবিদ্যুতের জন্য সবচেয়ে কমন যে ধারণাটা ব্যবহার করা হয়, সেটি হচ্ছে কোন স্রোতশীল নদীতে ড্যাম বা বাঁধ তৈরি করে উঁচু জায়গায় পানি আটকে রেখে সময়মতো সেই পানির স্রোতকে নিচে নামতে দিয়ে স্রোতের সাহায্যে টার্বাইন ঘুরিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুত উৎপাদন করা। জলবিদ্যুৎ মানব সভ্যতার ইতিহাসে বিদ্যুত তৈরি করার প্রাচীন একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি স্টেইট এ ব্যবহার করা হচ্ছে। ওয়াশিংটন স্টেইটই কেবল তার মোট বিদুত চাহিদার ৭০% পূরণ করে থাকে হাইড্রো ইলেকট্রিসিটি প্ল্যান্ট থেকে। 
এই হচ্ছে রিনিউয়েবল পাওয়ার রিসোর্স নিয়ে সাধারণ আলোচনা। এবার আসি এদের ভবিষ্যৎ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায়। 
রিনিউয়েবল এনার্জি নিয়ে গবেষকরা তাদের তথ্যে দেখিয়েছেন যে আগামী দুই থেকে চার দশকের মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মোট প্রয়োজনীয় শক্তির অধিকাংশই পাওয়া সম্ভব হবে এসব নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস থেকে, যদি এখন থেকেই আমরা ক্লিন এনার্জি ব্যবহারের চর্চা শুরু করি এবং আগ্রহী হই বৈষ্ণিক উষ্ণায়নের হার কমাতে। 
বর্তমানে অনেক দেশই ক্লিন এনার্জি রিসোর্স ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে এবং তারা তাদের প্রয়োজনীয় শক্তির বেশিরভাগই প্রাকৃতিক এসব উৎস থেকে তৈরি করছে। এসব দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ কোস্টারিকা, আইসল্যান্ড, আলবেনিয়া, প্যারাগুয়ে, ব্রাজিল, পোল্যান্ড, ডেনমার্ক ও জার্মানি। ন্যাচারাল রিনিউয়েবল রিসোর্স ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনে এসব দেশই বর্তমানে এগিয়ে রয়েছে। তারা তাদের দেশের ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী ন্যাচারাল রিসোর্সকে কাজে লাগাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে বলেই এমন অগ্রগতি। আমরাও পারি আমাদের দেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক নবায়নযোগ্য শক্তির উৎসসমূহকে কাজে লাগিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ শক্তির চাহিদাকে মেটাতে।
তবে ক্লিন এনার্জি আইডিয়াকেও পড়তে হচ্ছে চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশ্বের ক্রুড অয়েল বা তেল ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারছে যে ফসিল ফুয়েল পোড়ানোর পরিমাণ কমে যাওয়া মানেই তেল ব্যবসা ক্ষতির মুখে প্রায় বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা। তাই বিশ্বের বড় বড় সব তেল ব্যবসায়ী কোম্পানি তাদের ব্যবসার স্বার্থেই এ ক্লিন এনার্জি বিপ্লবের পক্ষে নয়। 
সুতরাং আমাদের এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে যে, ব্যক্তিস্বার্থের উর্দ্ধে গিয়ে দেশ ও বিশ্বের উন্নয়নে এবং ভবিষ্যতের সবুজ পৃথিবী গড়তে শামিল হতে হবে এই ক্লিন এনার্জির সবুজ পৃথিবী গড়ার বিপ্লবে।

সৌজন্যেঃ Ridwan UR Rahman
Share To:

Advices

Post A Comment:

0 comments so far,add yours