______________________________________________________
" একাকিত্ব "
______________________________________________________
একাকিত্ব (Loneliness):

সকলেই কোনো না কোনো সময়ে একাকিত্ববোধ করে। যখন আমরা নতুন কোনো কলেজ বা ইউনিভারসিটিতে ভর্তি হই, নতুন কোনো শহরে আসি অথবা ছুটির দিনে যখন আমাদের জন্য কারো সময় থাকে না। কিন্তু নৈমিত্তিক এই অনুভূতিটাই বিগত কিছু দশক ধরে লাখো মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী রুপ নিয়েছে।  ইংল্যান্ডে ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী ৬০ শতাংশ লোক প্রায়ই একাকিত্ব বোধ করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার ৪৬ শতাংশ লোক প্রতিনিয়ত একাকিত্ব বোধ করে। আমরা মানবজাতির ইতিহাসের সবথেকে উন্নত যোগাযোগপূর্ন সময়ে বাস করছি। মোবাইল-টেলিফোন, Facebook, Instagram ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা সার্বক্ষণিক একে অপরের সাথে যুক্ত। কিন্তু তারপরও আমাদের ভেতর একটি বিশাল অংকের মানুষ নিঃসঙ্গ অনুভব করে। নিঃসঙ্গতা আর একাকিত্ব এক জিনিস নয়। একাকিত্ব সম্পূর্ণভাবে একটি আত্ববাদী,  স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা। তুমি যদি একাকিত্ব বোধ কর তবে তুমি একাকি( if you feel lonely then you're lonely) . সাধারনত ঐ সকল মানুষ একাকিত্ব বোধ করে যারা সাধারণত জানেনা মানুষের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় অথবা, পারিপার্শ্বিকের স্বাপেক্ষে কিভাবে মানুষের সাথে ব্যবহার করতে হয়। একাকিত্ব যে কোনো মানুষকেই প্রভাবিত করতে পারে। অর্থ-সম্পদ, খ্যাতি, শক্তি, সৌন্দর্য, ব্যাক্তিত্ব কোনো কিছুই একাকিত্ব হতে রক্ষা করতে পারে না। কারন, এটা আমাদের বায়োলজিক্যাল  সিস্টেমের একটি অংশ।
.
একাকিত্ব (loneliness) কি? 

ক্ষুদার মতই একাকিত্ব একটি দৈহিক ক্রিয়া। ক্ষুদা আমদের দৈহিক চাহিদার দিকে খেয়াল দিতে বাধ্য করে, আর একাকিত্ব সামাজিক চাহিদার দিকে খেয়াল দিতে বাধ্য করে। আমাদের মস্তিষ্ক আমাদের সামাজিক চাহিদা সম্পর্কে খুবই যত্নবান ও সতর্ক। কারন লক্ষ বছর ধরে আমারা কিভাবে বেঁচে আছি এটি তারই সূচক কাঠি। আমাদের পূর্বপুরুষগণ পারস্পারিক সহযোগিতা ও নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের  জন্য প্রকৃতিতে টিকে থাকতে পেরেছে । আমাদের মস্তিষ্ক বেড়ে উঠেছে অন্যরা কিভাবে চিন্তা করে এবং অনুভব করে সেটি অনুধাবন করতে এবং অন্যদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে।  সামাজিক হওয়া আমাদের বায়োলজির একটি অংশ। একা একা থাকা, খাবরের ব্যবস্থা করা, সন্তানের যত্ন নেওয়া কার্যত অসম্ভব। সকলে একত্রে থাকা মানেই টিকে থাকা আর একা থাকা মানে মৃত্যু। আমাদের কোনো পূর্বপুরুষের মৃত্যুর জন্য বাঘ বা সিংহের মত হিংস্র জন্তু থেকেও বিপদজনক  ছিল,  সামাজিক দল থেকে বাদ পড়া।  আর এজন্যই আমাদের দেহ সৃষ্টি করল "সামাজিক ব্যাথা" (social pain), এই ব্যাথা হলো সামাজিক ভাবে প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে অভিব্যক্তিমুলক অভিযোজন। একাকি থাকার ফলাফল ছিল মৃত্যু, এ কারনেই একাকিত্ব এতটাই বেদনাদায়ক।  আর এই ম্যাকানিজম টা আমাদের একত্রে সংযুক্ত রাখার জন্য ইতিহাসের অধিকাংশ সময়ব্যাপী কাজ করছিল,  যতক্ষন না মানুষ তাদের জন্য নতুন আধুনিক পৃথিবী বানাতে শুরু করল। 
আজ একাকিত্ব যে মহামারি আকার ধারন করছে এর শুরু রেনেসা পরবর্তী যুগে। পশ্চিমা সংস্কৃতি একক ব্যাক্তির দিকে ফোকাস করতে শুরু করল। শিল্প বিপ্লবের দরুন  মানুষ গ্রাম ও কৃষিক্ষেত্র ত্যাগ করে শিল্প কলকারখানার দিকে অগ্রাসর হলো। যে সমাজ হাজার বছর ধরে টিকে আছে তা ভেঙে যেতে শুরু করল এবং শহর বেড়ে উঠল। যত দ্রুতই পৃথিবী আধুনিক হয়ে উঠছে এই একাকিত্বের ট্রেন্ডটাও খুব দ্রুত বাড়ছে। আজকের দিনে আমরা নতুন চাকুরী, শিক্ষার জন্য আমাদের পরিচিত সামাজিক জাল ছিড়ে অনেক দূর চলে যাই। খুবই অল্প লোকের সাথে দেখা করি আর যাদের সাথে দেখা করতাম তাদের সাথেও কদাচিৎ দেখা করি। অধিকাংশ মানুষ তাদের চাকুরী ও পড়াশুনার জন্য একাকী হয়ে পড়ে। আসলে অত্যাধিক কাজের জন্য বন্ধু, পরিবারের জন্য সময়ই থাকে না। আর এক্ষেত্রে সবথেকে সুবিধা জনক এবং সহজ হল,  বন্ধুদের সাথে ব্যায় করা সময়টুকু অন্য কাজে লাগানো।   যতক্ষন না একদিন সকালে উঠলে এবং বুঝতে পারলে কেমন যেন একঘরে (isolated)  বোধ হচ্ছে। 
.
একাকিত্ব কিভাবে শেষ করে দেয় : 

একটি বড় মাপের সমীক্ষা দেখিয়েছে যে, দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব থেকে যে ধকল (stress) আসে এটি মানুষের ভোগ করা সবথেকে খারাপ ও অস্বাস্থ্যকর বিষয় গুলির মধ্যে অন্যতম। এটি দ্রুত বয়স বাড়িয়ে দেয়, ক্যান্সার কে আরো মারাত্মক করে তোলে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। একাকিত্ব স্থুলতা থেকে দ্বিগুন এবং প্রতিদিন এক প্যাকেট সিগারেট খাওয়ার সমান মারাত্মক।  শারীরিক ও সামাজিক ব্যাথ্যা বা বেদনা মস্তিষ্কের একই সিস্টেম ব্যবহার করে। দুই ধরনের ব্যথাই বিপদজনক হিসেবে গন্য হয় এবং মানুষের ভেতর একধরনের আত্মরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ব্রেইন তখন সবধরনের ব্যাপারে বিপদের আভাস পায়। শুধু তাই নয়, ব্রেইন তখন সাধারন সামাজিক বিষয়গুলি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে। অন্যদের কথা গুলো শত্রু ভাবাপন্ন মনে হয়। অন্যদের ভালো ব্যবহার ও তখন খারাপ মনে হয়। এবং ব্রেইন নিজেকে রক্ষণশীল ও আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে। যেটা অন্যদের কাছে নিজেকে আরো উদাসীন, কিছুটা শত্রুভাবাপন্ন এবং সামাজিক ভাবে উদ্ভট (weird) করে তোলে। 
.
আমরা এটা সম্পর্কে কি করতে পারি (what can we do about it) : 

একাকিত্ব জিনিস টা যদি খুবই প্রকট আকার ধারন করে তবে প্রথম করনীয় বিষয় হলো ,  নিজে যে একটা খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়ে গিয়েছ এটা অনুধাবন করা। এটা সাধারনত এমন হয় যে, বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি নিজের ভেতর দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতার অনুভূতি সৃষ্টি করে। যার জন্য শুধুমাত্র মানুষের খারাপ দিকের প্রতি আমাদের ফোকাস চলে যায়। এটি অন্যদের প্রতি নিজের চিন্তাকে আরো নেতিবাচক করে। তারপর এটি আমাদের ব্যবহার কে পরিবর্তন করে, এবং এর ফলে আমরা সামজিক মিথষ্ক্রিয়া কে এড়িয়ে চলতে থাকি যা আমাদের আরো বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ক্লাসের সবার থেকে আলাদা হয়ে বসা, অন্যের কোনো কথা কে উপেক্ষা করা, এধরনের কারনের জন্য একাকিত্ব দায়ি। এর শেষ পরিণতি হল ডিপ্রেশন।
সুতরাং আমরা প্রথমত এটা সম্পর্কে যা করতে পারি তা হল, ব্যাপারটিকে সম্পূর্ণ সাধারন বিষয় ভেবে মেনে নেওয়া এবং এতে লজ্জা পাওয়ার কিছুই নেই। আক্ষরিক অর্থে প্রত্যেকেই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে একাকি বোধ করে। এটা মানুষের একটি সার্বজনীন একক অভিজ্ঞতা। এটা কখনই এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তবে তুমি যেটা করতে পার সেটি হল অন্যদের সাথে ব্যবহার ও কথা বলা পরীক্ষা করে দেখা...
১.অন্যরা আসলেই কি খারাপ ব্যবহার করছে নাকি নিজেই সেগুলো নেগেটিভ ভাবে নিচ্ছ?
২. বন্ধুরা কি আসলেই তোমাকে এড়িয়ে চলছে নাকি তুমি নিজেই দূরে থাকতে চাচ্ছ? 
৩. অন্যরা কি বলছে? তারা কি খারাপ কিছু বলছে নাকি তুমি তাদের কথায় অন্য অর্থ যোগ করছ? 
৪.তুমি কি মনে করছ মানুষ তোমাকে পাশে চায় না?
৫. বন্ধুদের কাছথেকে দূরে থাকার জন্য কারন খুঁজছ ? 
৬. নিজেকে অন্যদের কাছ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছো? 
৭. মনে করছ যে অন্যরা তোমার ক্ষতি করতে পারে?  
এরুপ বিষয়গুলি যদি খুবই খারাপ দিকে যায় তাহলে অবশ্যই প্রফেশনাল হেল্প নেওয়া জরুরী।

সব শেষে আমদের উচিত কিছু ভালো পদক্ষেপ নেওয়া। চলো কিছু কাজ করা যাক,  আজ ফ্রেন্ডলিস্ট এ যার সাথে কথা না হয় তার সাথে কথা বলার চেস্টা করি। যে বন্ধুর সাথে অনেক দিন কথা হয় না তাকে ফোন করি। কোনো বন্ধুর সাথে একটু ঘুরি । কোনো বন্ধুকে পড়ার জন্য সাহায্য করি। আর সর্বপরি কাউকে সাহায্য করার মধ্যে এক্সপেকটেশন না রাখি। 
-----------------------------------------------------------
Ref. books: 
i) Emotional First Aid - Guy Winch ph.D
ii) Loneliness -John T. Cacioppu and William Pattrick 
Source information : Google
[ YouTube channel: kurzgesagt (most of the talk translated from here)  
pic: Unsplash ]

সৌজন্যেঃ Sabbir Hasan Munna
Share To:

Advices

Post A Comment:

0 comments so far,add yours