ভুতের গল্প অদৃশ্য আওয়াজ (পর্ব ২)



আবার আরেক শ্রেণীর পাগল আছে যারা এক যায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকে এবং এক দৃষ্টিতে কোন কিছুর দিকে তাকিয়ে থাকে।

অনেকের উপর প্রয়োগ করা হয় কবিরাজি চিকিৎসা।শরীরের বিভিন্ন জায়গায় তাবিজ বেঁধে দেওয়া হয়।চলতে থাকে রুটিন মাফিক তেল পড়া পানি পড়া সেবন।নির্দিষ্ট সময়ে কবিরাজ আসবেন ঝাড় ফুঁক করবেন।দুষ্টু জ্বীনকে প্রশ্ন করা হবে কিসের বিনিময়ে সে চলে যাবে।কোন কোন জ্বীন একটা খাশিতেই সন্তুষ্ট থাকবে।আর কিছু জ্বীন আছে লোভী যারা ছয় থেকে সাতটি গরু দাবি করে।
আর কোন কোন জ্বীন আছে যেতেই নারাজ।
সে পরিষ্কার কথায় বলে দেবে-ওকে ছেড়ে আমি যাবো না ওকে আমার ভালো লেগেছে।
তার পর শুরু হবে জ্বীনের উপর নির্যাতন।

তবে ঝাড় ফুঁক দেওয়ার আগে কবিরাজ নিজের শরীর বন্ধ করবে। কেননা দুষ্টু আত্মা বা জ্বীন হলে সেটা কবিরাজের শরীরে ভর করবে।রাতে কবিরাজ কে আক্রমন করবে তিনি অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখবেন এবং স্বপ্নের মধ্যে ভয়ংকর কোন জন্তুর সাথে লড়াই করবেন।তারপরর ঘুম থেকে উঠে দেখবেন উঠুনে একটা প্যাঁচা বা কাক মরে আছে।এবাবে চলতে থাকে কবিরাজের চিকিৎসা।

তবে কী আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।না,এই ঘটনা কাউকে বলা যাবে না।যদি বলি তাহলে কেউ কেউ বলবে খারাপ জ্বীনে আসর করেছে।আবার কেউ কেউ বলবে হয়ত মাথায় সমস্যা দেখা দিয়েছে, হরমোনের অভাব দেখা দিয়েছে।ভালো ডাক্তারের শরণাপন্ন হও ।এভাবে একের পর এক পরামর্শ আসতে থাকবে।তখন আমার নিজের প্রতি সন্দেহ হবে।আমি নিজেকে প্রশ্ন করব সত্যিই কি আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।তারপর ধীরে ধীরে নিজের প্রতি বিশ্বাসের দানা বাদবে,যে আমি একজন পাগল।কখনো একা একা দাড়িয়ে হা হা অট্রহাসির রুল তুলবো।যা আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হবে কিন্তু আশপাশের লোক গুলা অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিতে তাকিয়ে থাকবে,কেউ কেউ আমার সাথে ও হাসবে।কোন চা স্টলের দুষ্টু কর্মচারী গ্লাসের জল ছুড়ে মারবে আমার দিকে।স্কুলের বাচ্চারা পাগল পাগল বলে চেঁচামেচি করবে।দুষ্টু ছেলেরা ঢিল ছুড়ে মারবে,কাঁধা ছুড়ে মারবে।বিয়ে বাড়িতে কিংবা কোন অনুষ্টানে ঢুকলে আমাকে ঘাড় ধাক্ষা দিয়ে বের করে দেওয়া হবে।
কথা গুলো ভাবতে ভাবতে কেমন যেন শিওরে উঠলাম,শরীর কাঁপুনি দিয়ে উঠলো।প্রতিটা লোম খাড়া হয়ে গেল।

সিগারেট প্রায় শেষের দিকে।জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে তারিনের কথা ভাবছিলাম।এই সেই তারিন যার মায়ায় পড়েছিলাম।একটু আগে যার মৃদু হাসির স্বর শুনেছি,স্পষ্ট ভাবে।যেন তারিন খুব কাছে বসে হাসছে।কিন্তু আমি তো ওর সাথে প্রেম করিনি।এমন তো না যে আমি ওর কাছ থেকে বড় ধরনের কোন আঘাত পেয়েছি।তাছাড়া ওকে তো মনেই পড়ে না,প্রায় ভুলে গেছি।তাহলে এমন ঘটবে কেন?
ভুত প্রেত কিংবা কোন অশুভ শক্তি এগুলা আমি বিশ্বাস করি না।হতে পারে এটা কোন মানসিক রোগ।তাছাড়া আমি এতটা চাপের মধ্যে না, যে আমার মস্তিষ্ক বিকারগ্রস্ত হবে।

সিগারাটের ধোঁয়ার কারনে রুমের মধ্যে পুড়া পুড়া গন্ধ ভাব চলে এসেছে।এই পোড়া গন্ধটা কিছু সময় থাকবে তারপর চলে যাবে।বাইরের দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।পূর্ণিমাতিথি চলছে।ভাবলাম ছাদে গেলে কেমন হয়,এরকম একটা রাতের দৃশ্য হাত ছাড়া করা যাবে না।দরজা খুলে ধীর পায়ে তিন তলার উপরে ছাদে চলে গেলাম।আমি আবার দ্বিতীয় তলার বাসিন্দা,সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠতে তেমন কষ্ট হয় না।

আমি এখন দাঁড়িয়ে আছি সৈয়দ মুজতবা আলী হলের দালানের ছাদের কিনার ঘেঁষে। এটি মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের ছাত্রাবাস "সৈয়দ:মুজতবা আলী হল"নামে পরিচিত।হলের ছাদে বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য উত্তম একটা স্থান।আমি এখন তাকিয়ে আছি সীমাহীন আকাশ গঙ্গার দূর প্রান্তে। গোলাকার থালার মত চাঁদ ঝুলে আছে আকাশের পশ্চিম কিনারে।
"নিঃস্বার্থে ধরনীর বুকে জ্যোৎস্না বিতরন করছে"
এটা কবির কথা।
কিন্তু আমি বলি ভিন্ন কথা।চাঁদেরও কিন্তু এখানে স্বার্থ আছে। যদি পৃথিবী একবার বলে দেয় ওই চাঁদ তুই আমাকে কেন্দ্র করে ঘুরতে পারবে না, তাহলে বেচারা চাঁদ যাবে কোথায়।আর এজন্য বুঝি তিনি অবলীলায় পৃথিবীর সেবায় নিয়জিত।
আমার চোঁখকে ফাঁকি দেওয়া অতটা সহজ না।তবে এই মুহূর্তে তাকে ধন্যবাদ দেওয়া যায় কেননা তার বিকিরিত আলোর সিহরণে পৃথিবীটাকে তাজা যৌবনময় মনে হচ্ছে।আর আমি এক উদ্ভট একাগ্রচিত্তে ধরনীর যৌবন রূপ উপভোগ করছি।
,
হঠাৎ করে কয়েকটা কুকুর রজনীর নিরবতা ভঙ্গ করে ঘেউ ঘেউ আওয়াজ তুলল।হালকা শীতল সমীরণের প্রবাহ বইতে লাগলো।শরীরটা একটু ঝাকুনি দিয়ে উঠলো।
রাশি রাশি জোছনা শরীরে আচড়ে পড়ছে,পশ্চিম আকাশে অনেক গুলা নক্ষত্র শারীবদ্ধভাবে ঝুলে আছে।উত্তর পশ্চিম কোনে হালকা বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
এক পা দুপা করে চাঁদটা এগিয়ে যাচ্ছে আকাশের পশ্চিম প্রান্তে।জ্যোৎস্নার আলো তির্জক ভাবে ভূপৃষ্টে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে।এক এক করে দালান গুলির বাতি নিভে যাচ্ছে হয়তো সবাই নিদ্রার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রজনী গভীর থেকে গভীরে অগ্রসর মান। পরক্ষনে নৈশ প্রহরীর গর্জন।আবারো নিস্তদ্ধতা ভঙ্গ হল।
দুর থেকে কয়েকটা শিয়ালের হাঁক অস্পট স্বরে ধ্বনিত হল আবার হারিয়ে গেল নির্জন প্রকৃতির বুঁকে।যদিও আশে পাশে কোন চাঁপা ফুলের গাছ নেই তারপরও এক রাশ চাঁপা ফুলের গন্ধ নাসারন্ধ্রে ধাক্ষা দিল।রাত্রে সাধারনতো পক্ষিকোলরা নিরব থাকে,,,,কিন্তু বসন্তে গভীর রজনীতেও কোকিল পাখি কুহু কুহু গান করে।তেমনি একটা কোকিল কুহু কুহু গান তুলল,এবং দুর থেকে আরো একটা কোকিল তার ডাকে সাঁড়া দিল।

প্যাকেটে আর একটি মাত্র সিগারেট আছে।আজকের রাতের শেষ সম্বল বলা যায়।ছাদে বসেই এটি তামাম করবো,আর প্রকৃতিকে কাছে টেনে নেব।গভীর রাতে প্রকৃতি আর আমি একে অপরের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাবো।

লাল রঙ্গের একটা টুল রাখা আছে ছাদে,রুদে ঝলসে এবং বৃষ্টিতে ভিজে এটি লাল থেকে সাদা রঙ্গে রুপান্তিরত হচ্ছে।হলের প্রকৃতি প্রেমিকরা এই টুলে বসে বসে প্রকৃতি দেখে,কেউবা আকাশ দেখে।আবার কিছু সৌখিন গায়ক আছেন যারা এই টুলে বসে গলা ছেড়ে গান গায়।

আপন মনে সিগারেট টানতে লাগলাম,কখনো চোঁখ বন্ধ করে কখনোবা আকাশের দিকে চেয়ে।
কি সুন্দর ধোঁয়ার কুন্ডুলি পাক খেতে খেতে প্রকৃতির সাথে মিশে যায়।ঠিক এই ভাবে আমিও যদি পাঁক খেতে খেতে প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে পারতাম!
সাথে সাথে একটা দৃশ্য দেখে সটান করে টুল থেকে উঠে পড়লাম।লাফের পর লাফ দিয়ে ছাদ থেকে নেমে রুমে চলে আসলাম।

সিগারেটের ভাসমান ধোঁয়ার মধ্যে আমি তারিনের মুখের অবয়ব দেখতে পেয়েছি।খুবই স্পষ্ট ভাবে চেহারাটা ধোঁয়ার মধ্যে ফুঠে উঠেছে।গভীর রাতে ছাদের উপর এমন দৃশ্য দেখার জন্য প্রস্তুত চিলাম না।কিছুটা ভয় পেয়েছি বটে।হতে পারে ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশন হচ্ছে।ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশন হচ্ছে এমন কিছু দেখতে পাওয়া বা শুনতে যা আসলে ঘঠছে না।কিন্তু কেন এমন হবে। তাহলে কী আমি জটিল কোন রুগের সম্মুখীন হচ্ছি।খুবই তাড়াতাড়ি একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে দেখা করতে হবে।

প্রায় তিন দিন পর সমস্যার সমাধান পেয়ে গেলাম।এখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছি। মাথার চাপা যন্ত্রনা কমে গেছে।অদ্ভুত দৃশ্যগুলাও আর দেখছি না।এটাকে রোগ বলা যায় না তবে বড় কোন রোগের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো।
আর এই সব কিছুর সুত্রপাত ঘটিয়েছে মাথার পাশে থাকা ছোট টেবিল ফ্যান।আমার চাচাতো ভাই সালমান একটু বিজ্ঞানী টাইপের। যে কোন বিষয় নিয়ে তুমুল ঝগড়াঝাঁটি শুরু করবে।তো সেদিন শুরু হয়েছিলো শব্দ ও শব্দের শ্রাব্যতার সীমা নিয়ে বিতর্ক।আমরা বিভিন্ন হার্জের শব্দ নিয়ে তর্ক করছিলাম।হঠাৎ করে আমার টেবিল ফ্যানের দিকে সন্দেহের তীর চলে গেল।সন্দেহের দানাটা বেঁধেছে উনিশ হার্জের একটা শব্দ তরঙ্গ নিয়ে।মানুষের শ্রাব্যতার সীমা সর্বনিম্ন ২০ হার্জ। অর্থাৎ এর চেয়ে কম হার্জের শব্দ মানুষ শুনতে পায় না।কিন্তু উনিশ হার্জের শব্দটা বিশ হার্জের শব্দের খুব কাছাকাছি থাকায় শব্দটা আমরা শুনতে পারি না ঠিকিই কিন্তু আমাদের মম্তিষ্কে ঠিকিই ধরা দেয়।মস্তিষ্কে সৃষ্টি করে চাপা যন্ত্রনা।স্বাভাবিক চিন্তাধারায় বিঘ্ন ঘটায়।এতে ঘটতে পারে হেলোসিনেশন।মস্তিষ্কে সৃষ্টি হয় অদৃশ্য কথোপকথন।তাছাড়া অস্বাভাবিক দৃশ্যের সৃষ্টি করে যা বাস্তব বলে মনে হয় কিন্তু বাস্তব না।সব কিছু মস্তিষ্কের ধোঁকা।

হঠাৎ করে হাতে একটা যন্ত্র নিয়ে সালমান রুমে প্রবেশ করলো।ও এতটা পাগলাটে হতে পারে
আমার জানা ছিলো না।টেবিল ফ্যান থেকে আসলেই কি উনিশ হার্জের শব্দ তরঙ্গ বের হচ্ছে সেটা পরীক্ষা করার জন্য শব্দের কম্পাঙ্ক নির্ণয়ের জন্য সনোমিটার নিয়ে এসেছে।

পরীক্ষা শেষে সালমান অবাক দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
--আমি বললাম কী হয়েছে?
--এমন ভাবে থাকিয়ে আছিস কেন?

--উত্তেজিত স্বরে বলল-
--ভাই আপনার আইডিয়া শক্তি তো দারুন।সত্যিই তো ফ্যান থেকে উনিশ হার্জের শব্দ তরঙ্গ বের হচ্ছে।

--------সমাপ্ত

লেখক: মাহফুজুর রহমান

Post a Comment

0 Comments

close