লম্বায় প্রায় ৩০০০ মাইলেরর উপরে ।
চীনের এই মহাপ্রাচীরের ধারণা বহুকালের পুরানা ।যখন থেকে সভ্যতার আবর্তন শুরু হয়েছে তলোয়ার ও রক্তের পরিমাপের উপর তখন থেকেই সারা প্রথিবীতে সবাই অনিরাপদ হয়ে গেছি । নিরাপত্তা বা আত্মরক্ষার বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে এই প্রাচীর নির্মাণের ধারণা হাজার বছরের পুরোনো । যেমন ,নিজের সাম্রাজ্য ও প্রজাদের বহি:বিশ্ব তথা যাযাবর জাতি থেকে বাঁচানোর জন্য খ্রিষ্টপূর্ব ২২০-২০৬ এ চীনের প্রাচীরের গোড়াপত্তন হয় । কয়েকটি প্রজন্মে ভাগ হয়ে সবশেষে আজকের মহাপ্রাচীর এর মূলভিত্তি রচিত হয় ১৫৬৯-১৫৭৫ এর সময়ে । যখন চীন পৃথিবীর সবথেকে বড় সেনাবাহিনী নিয়ে নিজেদের নিরাপত্তায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় ।
প্রথম খ্রীষ্টপূর্ব ২২০-২০৬ এর সময়ে ছিন সাম্রাজ্যর সম্রাট ছিন শ্রি হুয়াং অল্প কিছু জায়গা জুড়ে চীনের উত্তর দিকে নির্মাণ করেন মহাপ্রাচীর । যা সাধারণত পাথর ও কাদায় তৈরী ছিল । এরপর বাকি ছয়টি চীনা উপসাম্রাজ্য তাদের নিজেদের সীমানা সম্প্রসারণ করে । এরপর অনেক বছর কেটে গেলেও তেমন উল্লেখযোগ্য কোন উন্নতি সাধিত হয় না এ প্রাচীরের ইতিহাসের ।
চীনের ভৌগলিক সীমানার উত্তর দিকে ও ততকালীন মঙ্গোলিয়ান এর দক্ষিন দিকের সীমান্তে যাযাবর মঙ্গোলিয়ানরা প্রায় ২ হাজার বছর ধরে চীনাদের বসতবাড়িতে হানা দিত , আগুন ধরিয়ে দিত , লুট করত ফসল , খাবার , আর অর্থকড়ি । মূলত মঙ্গোলিয়ানদের বিরান ভুখন্ডতে খাদ্যের অভাব এই সমস্যাকে আরও ঘনীভূত করে ।
সেপটেম্বর ১৫৫০ , ততকালীন মিং সাম্রাজ্যের রাজধানী বেইজিং । মঙ্গোলিয়ান যাযাবর জাতির নেতা চেঙ্গিস খান এর উত্তরসূরী দারাই সুং গুদেনখান। শান্ত চীনা ভূখন্ডে একদিন হুট করে আক্রমন করে বসে অস্ত্রসজ্জিত ক্ষুধার্ত মঙ্গলিয়ানরা । রাজধানীর ৭০ মাইল দূরের জনপদে চলে গণহত্যা , লুণ্ঠন , আর যুদ্ধবন্দী করার নির্মমতা । এটি ছিল মঙ্গোলিয়ানদের সবথেকে ভয়াবহ আক্রমণ । তখন চীনের সম্রাটকে তারা একজন অন্ধ বন্দীর মাধ্যমে তাদের দাবি পেশ করে যে, মঙ্গোলিয়ানদের সাথে কুটণৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে ও ব্যবসাবাণিজ্য করতে হবে । তাহলে তারাও উন্নয়ন করতে পারবে নিজেদের ভূখন্ড । সম্রাট তার সভাসদ দের বুদ্ধিতে তাদের কাছে কিছুটা সময় চান । কিন্তু তলে তলে চলে নতুন কোন বুদ্ধির খোঁজ।
প্রায় এক মাস ধংস্বযজ্ঞ চালিয়ে অক্টোবর ১৫, ১৫৫০, মঙ্গোলীয়ানরা ফিরে যায় নিজেদের জায়গায় । বেইজিং এর যুদ্ধমন্ত্রীকে তার ব্যর্থতা ও যুদ্ধ না করে পালানোর অপরাধে শিরশ্ছেদ করা হয় রাজপ্রাসাদে সবার সামনে।
সেই সময় নতুন মুখ হিসাবে দেখা যায় চৌকস সেনা অফিসারকে । ২৩ বছর বয়সী , ছি চি গুয়াং। সে এই ধংস্বজজ্ঞ দেখে মঙ্গোলীয়ানদের রুখে দাড়ানোর পরিকল্পনা শুরু করে । ২ হাজার বছর ধরে বারে বারে এই মঙ্গোলিয়ান জাতি আত্রমন করে আসছিল চায়নার মূল ভূখন্ডর উত্তর দিকের কয়েক হাজার মাইল এলাকায় , সেই এলাকাতে সে স্থায়ী সমাধানের ধারণা আনে যা সম্রাটের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না ।
তাকে পাঠানো হয় জাপানীজদের আক্রমণ প্রতিহত করতে । নিজের চেষ্টায় তিনি গ্রামের কৃষকদের স্বদেশ বাঁচানোর লড়াই তে সৈনিক হিসাবে দাড় করান । তার নিজস্ব সৈন্যবাহিনী আত্মপ্রকাশ করে । জাপানীজদের সাথে কয়েকটা যুদ্ধে জয়লাভ করে …
এর ১৭ বছর পর, জাপানীজদের সাথে বীরত্বের জন্য ছি চি গুয়াং কে সেনাপ্রধান করা হয় । তার পদ জেনারেল । ঠিক সেই সময় আবার মঙ্গোলিয়ানদের আক্রমণের আশংকা তৈরী হয় । তখনকার সম্রাটকে দ্বিতীয়বার মঙ্গোলিয়ানদের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য মহাপ্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনার কথা বলা হয় । তার শত্রুদের প্রচুর বিরোধীতা সত্ত্বেও সম্রাট তাকে মহাপ্রাচীর তৈরীর অনুমতি দেন ।
সেনানায়ক তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করেন সত্যিকারের মহাপ্রাচীর নির্মানের ।
১৫৬৯ এর দিকে কাজ শুরু করা হয় প্রায় ২০ হাজার মানুষ নিয়ে এবং প্রাথমিকভাবে মূল অংশের প্রাচীর নির্মানের জন্য ৫ বছর সময় বেধে দেয়া হয় সেনাপ্রধান কে ।ইট পাথর আর পোড়ামাটি দিয়ে শুরু হয় কাজ । একেকটি ইটের ওজন প্রায় ২০ কেজি । মানুষ দিয়ে পাহাড়ের গায়ে উঠিয়ে নিয়ে একটার পর একটা গেথে তৈরী করা হত প্রতিটি দুর্গ এবং দেয়াল । কয়েকশ গজ পর পর একটি করে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এর পরিকল্পনা এবং সব সুদ্ধ কয়েক হাজার টাওয়ার এর নির্মাণ মোটেই সহজ ছিল না । কিন্তু পরিকল্পনাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজটাকে গুণগত দিক থেকে নিশ্ছিদ্র করা হয় । ৩০ ফুট উচু । এবং ১০ ফুট প্রশস্ত দেয়াল ।
কিন্তু প্রতিটি দেয়ালের নকশা নিশ্চিত করা হয় যেন তা পাহাড়ের চূড়ার উপর দিয়ে তৈরী হয় । এটা একটা বিশাল সামরিক পরিকল্পনা । ২৫০ জন করে ভাগ করা প্রতিটি দল মিলে প্রথম বছরে তৈরী করে ৭০ টি টাওয়ার যা কিনা পর্যাপ্ত ছিল না । প্রতি ৫ দিনে একটি করে টাওয়ার তৈরীর নির্দশ ছিল প্রতি ২৫০ জনের দলের প্রতি । তারা রাতদিন কাজ করত । রাজ্যের মোট আয়ের ৭৫ ভাগ নি:শেষ হচ্ছিল এই মহাপ্রাচীর প্রকল্পতে। কিন্তু বাধ সাধল কঠোর পরিশ্রমের কারণে ছড়িয়ে পড়া অপুষ্টি , চর্মরোগ, মানসিক অবসাদ সহ আরও কিছু রোগ । সৈনিকরা বছর ধরে পরিবার এর সাথে দেখা না করে যে কঠিন প্রকল্প শেষ করতে কাজ করছিল সেখানে বিনোদন বলতে ছিল না কিছুই । কঠিন পরিশ্রম শুধু । মরে যাওয়া সৈনিককে সহোদরের মতই ভেবে নিয়ে শেষকৃত্য শেষ করত বাকি সেন্যরা । পাতায় বোনা চাটাইয়ে তাদের মৃতদেহ সমাধিস্থ হত আজকের মহাপ্রাচীরের আশেপাশেই । গুয়াংচিয়াও , মহাপ্রাচীর নির্মাণের মহান সৈনিক তার আর সব সহযোদ্ধাদের মতই আজ ভুলে যাওয়া নায়ক । অথচ সে ই যোদ্ধাদের মধ্যে একনিষ্ঠতা, সহদরবৃত্তিকতা , এবং শৃংখলা বজায় রেখে মহাপ্রাচীরসফল করতে সচেষ্ট ছিল ।
জেনারেল ছি চিগুয়াং যখন দেখলেন তার সৈন্যরা বিদ্রোহ করে উঠতে পারে < তখন তিনি ঘোষণা দিলেন তাদেরপরিবার চাইলে তাদের সাথে যোগ দিতেপারে যা ছিল একই সাথে কাজ এগিয়ে নেয়া ও সেনাদের মনোবল চাঙ্গা রাখার উপায় ।
অনেক কঠিন পরিশ্রমের পর ১৫৭৫ সালের প্রথম দিকে প্রাচীরের প্রথম ধাপের কাজ শেষ হয় । কিছুটা দেরিতে ।
১৫৭৫ সালের মার্চ মাসের কোন একদিন এই প্রাচীর এর কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ হল । যাযাবর মঙ্গলিয়ানরা আবার আক্রমণ করে বসল প্রাচীর দ্বারা ঘেরা উত্তর প্রান্তে । কিন্তু এবার তারা সফল হল না । প্রাচীরের পিছনের সামরিক পরিকল্পনা কাজে দিল এবং যাযাবর রা পালিয়ে গেল ।
মহাপ্রাচীরের কার্যপ্রণালী :
এটি একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যা কাজ করবে তিন স্তরে । প্রথম স্তরে থাকবে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার । তার পিছনে সিগনাল টাওয়ারস । শত্রু আসার খবর সিগনাল টাওয়ারে পৌছানো হবে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে । সতর্ক হবে কামান ও গোলা সহ সিগনাল টাওয়ারের পিছনের প্রাচীরের দুর্গগুলো । প্রতিরোধ গড়ে তুলে ছত্রভঙ্গ করা হবে শত্রুদের । পিছনের ব্যাকআপ সৈন্যরা এসে তাদের শেষ সর্বনাশ করবে ।
স্বপ্নদ্রষ্টা জেনারেলের করুণ পরিণতি :
জেনারেল ছিচি গুয়াং এবং দেশের অর্থমন্ত্রীর পুরানো শত্রুরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেন যখন মহাপ্রাচীরের বাকি সামান্য কাজ শেষ করতে পুনরায় অর্থ চাওয়া হয় । শত্রুরা নতুন সম্রাটকে বোঝাতে সমর্থ হয় যে আপাতত এই প্রাচীরের সম্প্রসারণের দরকার নেই । সম্রাটও তাই মনে করলেন । বন্ধ হয়ে গেলে প্রাচীরের সম্প্রসারণ ও শেষ আচড় দেয়া । অর্থমন্ত্রী মারা গেলে জেনারেল ছি চি গুয়াং হারালেন রাজ্যসভায় তার ঢোকার পথ ও আস্থার জায়গা। ক্রমশ জেনারেল কে সরাতে ষড়যন্ত্র শুরু হল বেইজিং এ । তাদের কুমন্ত্রে অকর্মণ্য চীনা সম্রাট জেনারেল এর বিরুদ্ধে দুর্নীতি , অর্থ আত্মসাত ও সম্রাটকে খুন করে সিংসাসন দখলের মিথা অভিযোগ আনল । তাকে বরখাস্ত করা হল । তার বিচার করা হল । বছরখানেকের মধ্যে খুন হলেন তিনি । মহাপ্রাচীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়কালের সৈনিক নেতা হারিয়ে গেলেন । সেই অবস্থার পর কিছুটা সংস্কারের চেষ্টা হয়েছিল অবশ্য । তবে এখনকার যে মহাপ্রাচীরকে মানুষ পৃথিবীর অন্যতম আশ্চর্য বলে তার মহান স্রষ্টার জীবনাবসন হয় এভাবেই ।
আমরা এখন যে মহাপ্রাচীর দেখি তা এতটাই বিশালাকার যে মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে এর অস্তিত্ব দেখা যায় ।
#সংগৃহীত
Share To:

Advices

Post A Comment:

0 comments so far,add yours