নিকোলা টেসলা - The Unsung Hero of Science


নিকোলা টেসলা ~ The Unsung Hero of Science: যদি জিজ্ঞেস করা হয়, "আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কোন বিজ্ঞানীর অবদান সবচেয়ে বেশি?" বিতর্কের জন্য ভেরি ভেরি হট টপিক!! তবে হ্যাঁ, বেশিরভাগ ভোট যাবে টমাস আলভা এডিসন’ এর পক্ষে। যেই টমাস এলভা এডিসন হওয়া অনেক কিশোর মনের লালিত স্বপ্ন! সুচতুর ব্যবসায়ি এবং বিজ্ঞানী 'টমাস এলভা এডিসন'। তবে যাদের বিজ্ঞান নিয়ে কিছু জানাশোনা আছে, তারা এডিসন'কে বিজ্ঞানী না বলে সচতুর ব্যবসায়ী’ বলতে বেশি পছন্দ করে। এডিসন হচ্ছে তার সময়ের অন্যতম সচতুর এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী... এবং বিজ্ঞানীও... বিজ্ঞানের অন্যতম আবিষ্কার বৈদ্যুতিক বাল্ব তাঁর হাত ধরেই এসেছে। তবে মজার ব্যাপার হল, এডিসন বাল্বের আবিষ্কার পেটেন্ট করে না রাখলে, খুব অল্পদিনেই তা অন্য কেউ আবিষ্কার করে ফেলতো! এডিসনের বাল্বের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই ইংল্যান্ডের 'জোসেফ সোয়ান' নামের এক বিজ্ঞানী তার শহরে বৈদুত্যিক বাল্ব জ্বালান। তবে এডিসন সুকৌশলে 'জোসেফ সোয়ান' কে তার কোম্পানির অংশীদার করে ফেলেন! ১৮৮৪ সালে এই এডিসনেরই কোম্পানি 'Edison Power Co.' তে চাকরি নেন নিকোলা টেসলা। তাঁকে’কে কাজ দেয়া হল ডিসি জেনারেটর Redesign করার। টেসলা উল্টো বলে বসলেন, তিনি এই ডিসি জেনারেটর আরো ভালো করে বানাতে পারবেন! এই কথা শুনে এডিসন তাঁকে প্রস্তাব দেয়, যদি টেসলা এটা করতে পারে তবে তাকে ৫০ হাজার ডলার পুরষ্কার দেয়া হবে! এডিসন টেসলা'কে ৫০ হাজার ডলারের প্রস্তাব দিয়ে পরে বলেন, তুমি তো দেখি আমেরিকান রসিকতাও বুঝও না!!" কয়েকমাসের টানা খাটুনির পর 'টেসলা' শেষমেস, তাঁর কাজ শেষ করতে পারেন। তারপর টেসলা তার প্রস্তাবিত পুরস্কার চাইলে, এডিসন হেসে বলেন, "হা হা... তুমি তো দেখি, আমেরিকান রসিকতাও বুঝও না!!" টেসলার বেতন কেবল ১৮ডলার/ প্রতি-সপ্তাহ থেকে ২৮ ডলার/প্রতি-সপ্তাহ করে দেওয়া হল! টেসলা ছিলেন এমনিতেই খ্যাপাটে স্বভাবের! এডিসনের এরকম ধোকাবাজির পর, টেসলা খেপে গিয়ে এডিসন'কে দুই গাল শুনিয়ে চাকরি ছেড়ে দেন! এই সুযোগে টেসলা'কে লুফে নেয় এডিসনের প্রতিদ্বন্দ্বী ‘ওয়েস্টিংহাউজ ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানী' ! এর পরবর্তী ঘটনাগুলি “The War of Currents” নামে পরিচিত। The War of Currents (বৈদ্যুতিক যুদ্ধ): 'War of Currents' শব্দটা অনেকের জন্যেই নতুন... আবার যাদের বিজ্ঞান নিয়ে কিছু জানাশোনা আছে, তারা এডিসনের DC বিরুদ্ধে টেসলার AC নিয়ে এই যুদ্ধের সাথে পরিচিত। তবে সত্যিকার অর্থে, এই বৈদ্যুতিক যুদ্ধ শুধু এডিসন এবং টেসলার মধ্যকার না! এই যুদ্ধের সাথে আরেকজনের নাম জড়িয়ে আছে, তিনি হলেন 'Westinghouse'.এডিসনের কোম্পানি 'Edison Power Co.' এর চাকরি ছেড়ে দিলে, টেসলাকে লুফে নেয় Westinghouse নামের আরেক ব্যবসায়ী! টেসলা তখন চাকরি নেন ওয়েস্টিংহাউজ এর কোম্পানি 'Westinghouse Corp.' তে। [বলে রাখা ভালো, ওয়েস্টিংহাউজ ছিলেন এডিসনের ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দী! আর বিজ্ঞানি হিসেবেও ওয়েস্টিংহাউজের নাম ছিল।] ওয়েস্টিংহাউজের কোম্পানি'তে থাকাকালীন 'টেসলা' এডিসনের DC Current বা সমপ্রবাহ বিদ্যুতের বিরুদ্ধে নিয়ে আসেন AC Current বা পর্যায়বৃত্ত প্রবাহ । এডিসনের DC Current এর বিশাল দুর্বলতা হল যে, এটি বেশি দূর শক্তি পাঠাতে পারে না! ২/৩ কিলোমিটার যেতে না যেতেই দম শেষ! তাই 'পাওয়ার প্লান্টের ২ কিলোমিটার বাইরের ঘরবাড়িতে আর বিদ্যুৎ পৌছানো যায় না! কিন্তু টেসলার প্রযুক্তি ‘AC Current’ অর্থাৎ বর্তমানের এই প্রযুক্তিতে এমন কোনো সমস্যা নেই! টেসলা'র AC Current বনাম এডিসনের DC Current. টেসলা AC Current আবিষ্কার না করলে, এডিসনের প্রযুক্তি কাজে লাগাতে আমাদের প্রত্যেকের বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে জেনারেটর লাগতে হতো! এডিসন আর টেসলার ছিল আগে থেকেই দ্বন্দ, আর ওয়েস্টিংহাউজের সাথে তো এডিসনের পুর্ব ব্যবসায়িক শত্রুতা! তাই AC~DC এর এই দ্বন্দ'কে বলা হয় Tesla-Westinghouse vs Edison দ্বন্দ! ইতিহাসে যার নাম 'The War of Current'. টেসলা হয়তো এডিসন থেকে হাজার গুন বেশি মেধাবি ছিলেন, তবে চতুরতায় এডিসনের ধারে কাছেও ছিলেন না! এডিসনের ছিল ফিচলে বুদ্ধি! আর অসম্ভব ব্যবসায়িক জ্ঞান। এডিসন তার ব্যবসায়িক বুদ্ধি দিয়ে এইটুকু ঠিকই বুঝতে পেরেছিল, টেসলার AC Current এর সামনে তার DC Current মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে! তো তার কাছে বলতে গেলে পথ খোলা ছিল একটাই... যেকোনোভাবে AC কে দমিয়ে ফেলা। Edison vs Tesla-Westinghouse [The War of Currents] এডিসন তার সামাজিক অবস্থান এবং তার ক্ষমতার প্রয়োগ করে সাধারণ জনগণের সামনে DC এর সুবিধা এবং এর প্রচারোণা করতে থাকেন; অন্যদিকে AC কারেন্ট'কে হেয় করতে থাকেন! তবে এই পদ্ধতি খুব বেশি কাজে দেয় নি! তাই এডিসন টেসলা'কে অপমান এবং AC Current এর ব্যবহার বন্ধ করার জন্যে, জনসম্মুখে একটি সার্কাসের হাতি 'কে এসি ইলেকট্রিক শক দিয়ে সবার সামনে মেরে ফেলেন! এসি ক্যারেন্টের ভয়াবহতা তিনি সবার সামনে তুলে ধরেন। আর এটি মানূষের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে, তা ভুল বোঝাতে থাকেন। আধুনিক সভ্যতার ঘৃণ্যতম আবিস্কার - ইলেক্ট্রিক চেয়ার! তবে এর মধ্য দিয়ে লাভবান হয়, আমেরিকান পুলিশ! তারা অনেকদিন ধরে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামির 'ফাঁসি'র বিকল্প উপায় খুজছিলেন। তখন থেকে তারা ফাঁসিতে ঝোলানোর বদলে ‘Electric Chair’ এ বসিয়ে মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা শুরু করেন! অন্যদিকে, এডিসনের এতকিছু কোনো কাজে আসে নি! আর DC এর বিরুদ্ধে AC বিজয়ী হয়। এডিসনের চতুরতার বিরুদ্ধে টেসলার মেধা জিতে যায়! শেষমেশ বিনা রক্তপাতে শেষ হয় ইতিহাসখ্যাত The War of Currents. তবে এসি / ডিসি যুদ্ধ থেকে জন্ম নিয়েছিল আধুনিক সভ্যতার ঘৃণ্যতম আবিস্কার - ইলেক্ট্রিক চেয়ার ! এটা কতটা ভয়ংকর তা বিখ্যাত 'Green Mile' মুভিতে দেখা যায়! রেডিও এর আবিষ্কারকঃ মার্কনি না টেসলা! আমাদের সবার ছোটবেলায় একটা সাধারণ জ্ঞানের বই ছিল। সেখানে আবিষ্কার এবং আবিষ্কারক নামের অধ্যায়ে সুন্দর করে লেখা ছিল, ‘রেডিও এর আবিষ্কারক মার্কনি।” রেডিও এর আবিষ্কারকঃ মার্কনি না টেসলা?? অনেকেই ইতিমধ্যে গুগলে সার্চ দিয়ে ফেলছে, “Who Invented Radio?” সার্চ আন্সারে মার্কনির নাম এবং ছবি দেখে আমাকে এতক্ষণে “গাধা, শালা...” ও বলে ফেলছে! তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, আরেকটু কষ্ট করে, “Who Really Invented Radio” লিখে সার্চ দিন। উত্তর কি এল?? কনফিউজড?? আসলে, 'রেডিও এর আবিষ্কারক' এই ছোট্ট একটা বাক্যের সাথেই জড়িয়ে আছে অনেক বিতর্ক! আমরা কেউ কেউ আগে উড়াধূরা শুনেছি বাঙালি বিজ্ঞানি 'জগদীশ চন্দ্র বসু' আগে রেডিও আবিষ্কার করেছেন। তবে এর সত্যতা বা এর ভিতরের কাহিনী বলতে গেলে কেউই জানি না! রেডিও এর আবিষ্কারক কথাটির সাথে 'জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল', 'আলেক্সান্ডার পোপভ' ' স্যার অলিভার লজ' 'হাইনরিখ হার্জ' ' জগদীশ চন্দ্র বসু ' 'মার্কনি' ' নিকোলা টেসলা' ... এদের সবার নাম আসে। তবে নাম স্থায়ী হয় শুধুমাত্র গুইয়েলমো মার্কনি (Guglielmo Marconi) 'র। মজার ব্যাপার হল, মার্কনি 'রেডিও সিগন্যাল' সম্পর্কে প্রথম জানেন ১৮৯৪ সালে... যার ৭/৮ বছর আগে থেকেই জগদীশ চন্দ্র বসু এবং নিকোলা টেসলা এ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছিলেন! মার্কনির আবিষ্কার করা প্রথম যে রেডিও সিগন্যাল, সেটা তিনি পাঠাতে পেরেছিলেন তার বাড়ির চিলেকোঠা পর্যন্ত মাত্র! অন্যদিকে ১৮৯১ সালেই (যখন মার্কনি রেডিও সিগন্যাল কি তাই জানতেন না! ) টেসলা কয়েল ব্যবহার করে নিকোলা টেসলার আবিষ্কৃত রেডিও সিগন্যাল সেকেন্ডে ১৫,০০০ সাইকেল বা চক্র সম্পন্ন করতে পারতো! টেসলা রেডিও আবিষ্কারের পেটেন্ট করেন ১৮৯৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর। তাই মার্কনি ১৯০০ সালের ১০ নভেম্বর এর পেটেন্ট করতে গেলে, তাকে সোজা রাস্তা মাপতে বলা হয়! কারণ, মার্কনি মূলত টেসলার মডেলই নিজের মত করে সাজিয়ে নিয়ে এসেছিল! তবে, ১৯০৪ সালে মার্কনি আবার তার মডেল নিয়ে পেটেন্ট অফিসে যান। কিন্তু সেইবার কোনো এক অজানা কারণে টেসলার নাম কেটে দিয়ে মার্কনির নামে রেডিও পেটেন্ট ইস্যু করে দেওয়া হয়! কেন কে বলবে! তবে তৎকালীন অনেক প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এটা করা হয় মার্কনি'র পরিচিত কিছু ক্ষমতাবানদের সুপারিশে!! টেসলা'কে এ ব্যাপারে বলা হলে, তিনি জবাব দিলেন, "মার্কনি ছেলেটা ভদ্র। সে যা করছে করতে দাও। সে ইতোমধ্যে আমার ১৭টা পেটেন্ট নিজের বিভিন্ন আবিষ্কারে ব্যবহার করেছে!" [Wait.. What?? ১৭টা পেটেন্ট!! ] মার্কনি এই রেডিও আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কারও পান.!! তবে টেসলা'কে কখনো নোবেল সম্মান দেওয়া হয় নি! সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, ১৯৪৩ সালে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট রেডিওর পেটেন্টে ইতালিয়ান বিজ্ঞানী মার্কনি’র নাম বাতিল করে দিয়ে আবার নিকোলা টেসলার নাম ঘোষণা করেছিলো!! কিন্তু ততদিনে নিকোলা টেসলা মৃত! শুধু রেডিও না টেসলা’র এমন আরো অনেক আবিষ্কারের পাশেই অন্যের নাম জুড়ে দেওয়া! তিনি কখনোই যথেস্ট মর্যাদা পান নি। তাঁকে বলা হয়, “The Dark Knight of Science” নিকোলা টেসলা ~ The Dark Knight of Science: নিকোলা টেসলা'কে নিয়ে বলা হয়, ‘তিনি হাওয়ায় হাত ঘুরালেও আইডিয়া পেতেন!’ তিনি এই মাত্রায় মেধাবি ছিলেন! তাঁর সেই মেধার প্রমাণ?? তাঁর নামে ২৬টা দেশে ৩০০ আবিষ্কারের পেটেন্ট!! রেডিও এবং ফ্লুরোসেন্ট বাল্বের মত তাঁর অনেক বড় বড় আবিষ্কার অন্যেরা নিজেদের নাম করে চালিয়ে দিয়েছে! টেসলার অনেক মৌলিক আবিষ্কার চুরি করে, হয়তো ডিজাইন একটু এদিক-সেদিক করে বা কিছুটা উন্নত করে অনেকেই ইতিহাসখ্যাত হয়েছে, তাদেরকে আমরা সবাই চিনি। আমাদের পাঠ্যবইয়ে রয়েছে তাদের নাম। আর টেসলা?? তিনি হয়ে গেলেন হারিয়ে যাওয়া এক মহারথী!! টেসলা তাঁর গবেষণার বাইরের বাকি সময়ের দীর্ঘাংশ ব্যয় করেছেন এইসব চুরি হওয়া আবিষ্কারের পেটেন্ট নিয়ে কোর্টে লড়াই করতে! কিংবা তার বেঁচে থাকার খরচ জোগাতে! Nikola Tesla ~ The Dark Knight of Science বেঁচে থাকার খরচ যোগাতে টেসলা তখন কাজ করেন ওয়েস্টিংহাউজ কোম্পানির হয়ে। সেখানে থেকে তিনি আবিষ্কার করেন, চলবিদ্যুতের সাশ্রয়ী উৎপাদন। তিনি 'নায়াগ্রা জলপ্রপাতের ' শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাসা-বাড়িতে ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হন! বিশ্ব পরিচিত হয় ‘আধুনিক জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র’ এর সাথে! কিন্তু জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের আবিষ্কারক হিসেবে তো সবাই চেনে ওয়েস্টিংহাউজ'কে! বেঁচে থাকার খরচ যোগাতে টেসলা কার কাছে মেধা বিক্রি করেছিল নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে! বিশ্ব জানে, ১৯৩৫ সালে 'রবার্ট ওয়াটসন ওয়াট' রাডার আবিষ্কার করেন। তবে তার ১৮ বছর আগেই ১৯১৭ সালে টেসলা যে রাডারের থিওরি দিয়ে যান, এটা বিশ্ব জানে না!! ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন টেসলা US নেভির জন্য রাডার টেকনোলোজির প্রস্তাব দেন। মজার ব্যাপার হল, তৎকালীন সেখানকার রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এর প্রধান ছিল এডিসন... জ্বি হ্যাঁ, থমাস এলভা এডিসন!! এডিসন টেসলার নাম দেখেই সেই প্রযুক্তি বাতিল করে দেন! তিনি নৌবাহিনীর শীর্ষকর্মকর্তাদের বোঝান যে, এটা একেবারে অদরকারি-ফালতু প্রযুক্তি, নৌবাহিনীর কোনো কাজের না! এর ১৮ বছর পর একই কাজ করে, রবার্ট ওয়াটসন ওয়াট বিশ্ববিখ্যাত হোন।টেসলার এরকম আরো অনেক আবিষ্কার হাতছাড়া হয়ে যায়! তাঁর অর্ধেক সম্পর্কেও আমরা জানি না! তবে এটা অনেকটা চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়, তিনি স্বীকৃতি পান নি এমন আবিষ্কারের চেয়ে, তাকে আবিষ্কারই করতে দেওয়া হয় নি, বা সেগুলি লুকিয়ে রাখা হয়েছে, এমন আবিষ্কারের সংখ্যা ঢের বেশি! "I don't Care that they Stole my Idea. I care that they don't have their Own. ~ Nikola Tesla" নিকোলা টেসলা ~ হারিয়ে যাওয়া এক মহারথী... আমাদের বর্তমান জীবনকে এত আধুনিক করার পিছনে সবচেয়ে বেশি যার অবদান... তিনি হলেন, নিকোলা টেসলা! বিদ্যুত, টেসলা কয়েল, ইন্ড্রাকশন মোটর, রাডার, রিমোট কন্ট্রোল, রেডিও তরঙ্গ... সবকিছুই আবিষ্কার... অবহেলিত টেসলার! জ্ঞানপ্রেমীরা দুঃখবোধ করে যে, টেসলার অধিকাংশ আবিষ্কার অন্যেরা নিজের নামে চালিয়েছে। তবে তারা এটাও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে, টেসলা'কে যদি তার সব আবিষ্কার শেষ করতে দেওয়া হতো, তাহলে এ পৃথিবীর চেহারা ভিন্ন হতো! টেসলা শুধু একজন অসাধারণ প্রতিভাবান আবিষ্কারকই ছিলেন না! তিনি মানবতাবাদী সমাজসেবক এবং দেশপ্রেমিকও ছিলেন। [যা অধিকাংশ বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় না!] টেসলা আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন 'ফ্রি এনার্জি' । টেসলার শেষ স্বপ্ন ছিল,সবার জন্যে ফ্রি ইলেকট্রিসিটি'র ব্যবস্থা করা! তিনি অনেকখানি সফলও ছিলেন, তার সেই চেস্টায়! তবে কোনো ব্যবসায়ি তাতে রাজি ছিলেন না! কারণ, এতে তাদের ব্যবসায়িক কোনো ফায়দা নেই! তাই তিনি 'টেলিকমিউনিকেশনস' তৈরির নাম করে এক ফাইন্যান্সার এর টাকায়, একটি টাওয়ার নির্মাণ শুরু করেন। 'টেসলা টাওয়ার'. .. যেখান থেকে মানুষ ফ্রি ইলেক্ট্রিসিটি পাবে! Nikola Tesla ~ The Unsung Hero of Science তবে তার ফাইন্যান্সার কোনোভাবে এ সম্পর্কে টের পেয়ে যান যে, এটাতে তার আর্থিক লাভ নাই। তিনি সেই টাওয়ার বন্ধ করে দিলেন! তবে শেষমেশ, টেসলার এই আবিষ্কার শেষ করতে দেওয়া হলে, আমাদের বিদ্যুতের জন্য প্রয়োজন হতো শুধু একটি এন্টেনা'র!! যারা সাইন্সফিকশন মুভি পছন্দ করে, তারা 'স্যাটেলাইট থেকে ডেথ রে মারা' এর সাথে পরিচিত; একে আমরা সাইন্সফিকশন মনে করি। সাইন্সফিকশন হল ভবিষ্যতের বিজ্ঞান, তবে এই ডেথ রে ভবিষ্যতে নয়... আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে টেসলাই ডিজাইন করে গেছেন! টেসলা যুদ্ধ ঘৃণা করতেন। তবে দেশের সুরক্ষা ব্যবস্থার কাজে ব্যবহার এবং যুদ্ধ প্রতিরোধের জন্য তিনি 'ডেথ রে ' প্রজেক্ট হাতে নেন। ডেথ রে হল ৮০হাজার ভোল্টের 'হাই পাওয়ারড পার্টিকেল বিম' । এটি যাত্রা পথের সবকিছু ভেদ করে, ২৫০ কিলোমিটার দূরের কোনো বস্তুকেও ছাই বানিয়ে ফেলতে পারতো!! তবুও ব্রিটিশ ও অ্যামেরিকান সরকার এই প্রোজেক্ট'কে কোনো পাত্তা দেন নি! টেসলার জীবনের আরেকটি চেস্টা ছিল, 'আবহাওয়া নিয়ন্ত্রন'! টেসলা স্বতন্ত্র্য রেডিও ওয়েভ ব্যবহার করে পৃথিবীর আয়োনস্ফিয়ার কে প্রভাবিত করার মাধ্যমে বিশাল আকারের 'স্ট্যান্ডিং ওয়েভ' তৈরি করেছিলেন। যা পরবর্তীতে বায়ুর গতিপথ নিয়ন্ত্রনে ব্যবহার করা হয়। আর বায়ুর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে, আবহাওয়াও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে! টেসলা প্রমাণ করে গিয়েছেন আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রয়োজনীয় তরঙ্গ সৃষ্টি করা সম্ভব! তবে এখানেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় আমেরিকান সরকার! এই আবিস্কার ভুল মানুষের হাতে গেলে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হতে পারে... এই দমিয়ে দেওয়া হয় টেসলা এবং তার আবিষ্কারকে! টেসলা'র এই স্ট্যাচু'টি ফ্রি Wifi সিগন্যাল দিয়ে যাচ্ছে টেসলার না জানি এরকম আরো কত আবিষ্কার আছে, যা সম্পর্কে আমরা জানি না এবং কখনোও জানবো না! যেগুলির ব্যবহার হলে, হয়তো আজ আমাদের পৃথিবীই সম্পূর্ণ অন্যরকম হতো! আর হ্যাঁ, একটু মজার তথ্য জানিয়ে রাখি, টেসলা শেষ পর্যন্ত আমাদের ফ্রি এনার্জি দিয়ে যেতে না পারলেও, আমেরিকা'র সিলিকন ভ্যালে'তে তৈরি তাঁর একটি মূর্তি Free Wifi সিগন্যাল দিয়ে যাচ্ছে! নিকোলা টেসলাঃ দা ম্যাড সায়েন্টিস্টঃ টেসলার অনেক অনেক আবিষ্কারের মধ্যে একটি হলঃ "টেসলাস্কোপ" । মহাবিশ্বে ট্রেস্ট্রিয়াল যোগাযোগের জন্য তিনি এই "টেসলাস্কোপ" তৈরি করেন। টেসলা সেখান থেকে দাবি করেন, তিনি অ্যালিয়েন সিগ্ন্যাল ট্রেস করতে পেরেছিলেন! তবে এই দাবির পক্ষে টেসলার প্রমাণিত কোন যুক্তি ছিল না। কেউ তাঁর বিশ্বাস করে নি। তিনি সবার হাসির পাত্রে পরিণত হোন। আবার একবার তিনি মিডিয়ার সামনে জোর গলায় ঘোষণা দেন, তিনি ‘ভয়ংকর মৃত্যু রশ্মি’ আবিষ্কার করেছেন! মানুষ তাঁকে ‘Mad Scientist’ নাম দেবে না তো কাকে দিবে!? বিজ্ঞানের অনেক গুরুত্বপুর্ণ আবিষ্কারের পাশাপাশি টেসলা অনেক মজার মজার আবিষ্কারও করে গেছেন... অনেকের ধারণা বিজ্ঞানীরা ‘নোংরা-খবিশ’ টাইপের হয়ে থাকে! আর বিজ্ঞানীদের বেলায় জানি না... তবে টেসলা হলেন ঠিক তাঁর উল্টো! এমনকি তিনি মানুষের শরীরের ময়লা-জীবাণু পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে বাথটাবও তৈরি করেছিলেন। বাথটাব তৈরি আবার এমন কি? তবে টেসলার তৈরি বাথটাবে গোসল করতে পানির বদলে বিদ্যুৎ ব্যবহার হত! টেসলা একটা ভূকম্পন যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন। সেটা দিয়ে তিনি নিউইয়র্ক শহরে রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটিয়ে ফেলেন! টেসলা দাবি করেছিলেন, তিনি ইচ্ছা করলে, ভূমিকম্পের মাধ্যমে পুরো মানবজাতি ধ্বংস করে ফেলতে পারবেন। এমনকি পুরো পৃথিবীকে দুইভাগে স্লাইস করে ফেলতে পারবেন! টেসলা একবার কোন বই পড়লে সেই বই মুখস্ত বলে দিতে পারতেন! একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে, ‘ফটোগ্রাফিক মেমোরি’ । হাজার হাজার ডিজাইন তিনি মাথার মধ্যেই করে ফেলতে পারতেন! খাতায় লেখার প্রয়োজন হতো না! টেসলা ৮টি ভাষায় কথা বলতে পারতেন! প্রতিদিনে ২ঘণ্টার বেশি কখনো ঘুমাতেন না ! তবে ‘ব্যাটারি রিচার্জ’ করার নাম করে মাঝেমধ্যে ঝিমাতেন। স্কুলে টানা ৪৮ ঘণ্টা বিলিয়ার্ড খেলেছেন!একবার ল্যাবে ৮৪ ঘণ্টা একটানা কাজ করেছেন! আমরা পাগল তাদেরকেই বলি, যাদের কাজকর্ম সাধারণ মানুষের মত না। আর টেসলা তো আমার-আপনার সাধারণ মানুষ না... তো তাঁকে পাগল বলা উচিত না তো কাকে বলা উচিত! তাঁকে খুবই যথাযথ নাম দেওয়া হয়েছে “দা ম্যাড সায়েন্টিস্ট”! ১৯৪৩ সালের ৭ জানুয়ারি। ৮৬ বছর বয়সে নিজের হোটেল রুমে মারা যান ‘দা ম্যাড সায়েন্টিস্ট নিকোলা টেসলা'! এর দিনদুয়েক আগে তাঁর হোটেল রুমের দরজায় "Do Not Disturb" সাইন ঝুলিয়েছিলেন তিনি। এই সাইন উপেক্ষা করেই, হোটেলের মেইড 'এলিস ' ভিতরে ঢুকে যায় এবং টেসলার লাশ আবিষ্কার করে! ডাক্তার'রা বলেন, Coronary Thrombosis হল মৃত্যুর কারণ। কিন্তু এখনও অনেকেই বিশ্বাস করে, খুন হয়েছিলেন টেসলা!! টেসলার মৃত্যুর পর, FBI টেসলার হোটেল রুমে হামলা চালিয়ে তাঁর সমস্ত গবেষণা, কাগজপত্র, স্যুটকেস নিয়ে যায়! একবিংশ শতাব্দীতে এসেও, এসব গবেষণার কাগজপত্র আজও আমেরিকান সরকার অত্যন্ত সুরক্ষিত ভল্টে জব্দ করে রেখেছে!! সেসব কাগজপত্রে আরো কি কি আবিষ্কারের আইডিয়া ছিল, যা আমরা এখনও জানি না!! তবে জীবদ্দশাতেই, নিকোলা টেসলা একাই বিজ্ঞান'কে অনেকদূর নিয়ে গেছেন! টেসলা না থাকলে, হয়তো আমরা এই অবস্থায় থাকতাম না! আমাদের প্রত্যেকের বাসা বাড়িতে বিশাল বিশাল জেনারেটর স্থাপন করতে হতো! 'রিমোট কন্ট্রোল' কি হয়তো আমরা জানতাম না! ' রেডিও তরঙ্গ', 'রাডার' বা 'এক্স রে' হয়তো থাকতো... তবে এত উন্নত অবস্থায় কিনা বলা যায় না! আর টেসলা এখনও থাকলে?? আমাদের প্রতিমাসে বিদ্যুতের বিল দিতে হতো না... এনার্জি হতো ফ্রি! হয়তো এলিয়েন সম্পর্কে আমরা যেনে যেতাম! হয়তো আমরা আবহাওয়া নিয়ন্ত্রন করতাম! টেসলা থাকলে এই এত্তগুলা "হয়তো" আসলেই "হয়ে যেতো"... হয়তো! টেসলা'কে বলা হয়, 'দা হিরো অফ সাইন্স'... "The Unsung Hero of Science.” তবে টেসলা শুধু, সাইন্সের হিরো না... সিনেমার হিরোও!... না তিনি সশরীরে কোনো সিনেমায় অভিনয় করেন নি, তবে তাকে নিয়ে বেশ কিছু মুভি বের হয়েছে! কখনো তাকে আবিষ্কারক দেখিয়ে, আবার কখনো ভিলেন!! আমরা 'সুপারম্যান' কার্টুনে ভিলেনের চরিত্রে যে "ম্যাড সায়েন্টিস্ট"কেদেখি তা আসলে টেসলাই! আবার 'ক্রিস্টোফার নোলান' তাঁর বিখ্যাত মুভি ' The Prestige' এ আবিষ্কারক টেসলার ক্যারেক্টার চমৎকারভাবে ফুটে এসেছে! এজন্য 'ক্রিস্টোফার নোলান' ধন্যবাদের যোগ্য দাবিদার। Tesla ~ The Hero! হ্যাঁ, এখনো অনেকেই টেসলা'কে চিনে না! তবে হ্যাঁ, তিনি আমাদের স্মরণে থাকবেন। একটি অসাধারণ লাইন, "যতদিন সত্যান্বেষী মন পৃথিবীতে থাকবে তারা খুজে ফিরবে টেসলাকে আর টেসলা বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে। বিকজ আইডিয়াস আর বুলেটপ্রুফ!!!" টেসলা'কে শ্রদ্ধা জানিয়ে শেষ করছি, এই নোট। এতক্ষণ ধৈর্য নিয়ে পড়ার জন্য আপনাদের সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ Collected

Post a Comment

0 Comments

close